Maksuda Lisa, Dhaka,
ক্রিকেট প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আবেগ ও উত্তেজনার খেলা। উইকেট পাওয়ার পর খেলোয়াড়ের উচ্ছ্বাস থাকবে। চাপের মুহূর্তে প্রতিক্রিয়াও থাকবে। কিন্তু সেই আবেগ যখন এমন আচরণে প্রকাশ পায়, যা প্রতিপক্ষকে অসম্মানিত বা উসকানিমূলক পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে, তখন বিষয়টি শুধু মাঠের আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের আচরণও নির্দিষ্ট নীতিমালা ও আচরণবিধির আওতায় পড়ে।
সাম্প্রতিক নারী এশিয়া কাপের দুটি ঘটনা বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে। পাকিস্তানের অধিনায়ক ফাতিমা সানা এবং বাংলাদেশের অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি ভিন্ন কারণে শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। ঘটনা দুটি একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—সমালোচনা, জবাবদিহি ও আবেগকে কীভাবে ব্যক্তিগত অপমানে পরিণত না করে প্রকাশ করা যায়?
ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে পাকিস্তানের অধিনায়ক ফাতিমা সানা দ্বিতীয় ওভারে ভারতের শেফালি ভার্মাকে আউট করার পর প্যাভিলিয়নের দিকে একটি অঙ্গভঙ্গি করেন। একটি ওভার হলো ছয়টি বৈধ বলের সমষ্টি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) তাঁর এই আচরণকে আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে। ফাতিমাকে ম্যাচ ফির ১০ শতাংশ জরিমানা ও একটি ডিমেরিট পয়েন্ট দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ স্বীকার করে শাস্তি মেনে নেন। একজন অধিনায়ক হিসেবে তাঁর আচরণ সতীর্থ, প্রতিপক্ষ, দর্শক ও তরুণ ক্রিকেটারদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই নেতৃত্বের দায়িত্ব শুধু মাঠের কৌশল নির্ধারণে সীমাবদ্ধ নয়। আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিপক্ষকে সম্মান করাও পেশাদার নেতৃত্বের অংশ।
বাংলাদেশের নিগার সুলতানা জ্যোতির ঘটনা ছিল ভিন্ন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে অনুমোদিত সময়ের ছাড় বিবেচনার পর বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এক ওভার কম শেষ করে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ম অনুযায়ী ধীর ওভার-রেটের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।
নিগার অভিযোগ স্বীকার করে প্রস্তাবিত শাস্তি মেনে নেন এবং পাঁচ শতাংশ জরিমানার মুখোমুখি হন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, পাঁচ শতাংশ জরিমানা প্রতিটি বাংলাদেশি খেলোয়াড়ের ওপর আরোপ করা হয়নি। বিষয়টি ছিল দলের ধীর ওভার-রেট এবং অধিনায়ক হিসেবে নিগারের শাস্তি গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই পার্থক্য দেখায়, একটি ঘটনার সঠিক অর্থ তুলে ধরতে তথ্য ও শব্দচয়নের নির্ভুলতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
দুটি ঘটনা দেখায়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শৃঙ্খলা শুধু বড় ধরনের অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। একটি অঙ্গভঙ্গি কিংবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওভার শেষ করতে না পারাও পেশাগত পরিণতি ডেকে আনতে পারে। নিয়ম মানা, প্রতিপক্ষকে সম্মান করা, সময়ের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করাও পেশাদার খেলোয়াড়ের আচরণের অংশ।
তবে সমালোচনা করা এবং কাউকে অপমান করা এক বিষয় নয়। ফাতিমার অঙ্গভঙ্গিকে অশোভন বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রত্যাশিত আচরণের সঙ্গে অসঙ্গত বলা যেতে পারে। একইভাবে বাংলাদেশের ধীর ওভার-রেট নিয়ে সময় ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু কোনো খেলোয়াড়কে অপমান করা, তাঁর চরিত্র নিয়ে আক্রমণ করা বা অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করা প্রয়োজনীয় সমালোচনার অংশ হতে পারে না।
এখানেই ননভায়োলেন্ট জার্নালিজমের গুরুত্ব। কোনো আচরণ বা সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেও ব্যক্তিকে আক্রমণ না করা সম্ভব। ঘটনার প্রেক্ষাপট, যাচাই করা তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত সামনে রেখে আলোচনা করলে সমালোচনা আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একটি ছোট ভিডিও বা ছবি দেখে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে পুরো ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানেই ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়। মতপার্থক্যও সংঘাতের কারণ হতে হবে এমন নয়। ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ ও প্রকাশ করা সম্ভব। ভুলকে ভুল বলা যায় এবং অনুপযুক্ত আচরণকে প্রশ্নও করা যায়। তবে তথ্য, প্রেক্ষাপট ও মানবিক মর্যাদার প্রতি সম্মান রেখে করা সমালোচনা ব্যক্তিগত আক্রমণের চেয়ে বেশি কার্যকর। ননভায়োলেন্ট জার্নালিজমের শক্তি এখানেই—মানুষকে আক্রমণ না করে তার কাজ বা সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করা এবং ভিন্ন মতকে সংঘাতে না ঠেলে দায়িত্বশীল আলোচনার সুযোগ তৈরি করা।